আমি ফিলিস্তিন থেকে বলছি

চিঠিটা আপনাদের কাছে পৌছানোর আগ পর্যন্ত আমি থাকবো কিনা জানিনা। মৃত্যু অনেক কাছে এসে গেছে। এখন অবশ্য জীবন থেকে মৃত্যুই বেশি সহজ হয়ে পড়েছে। মৃত্যুরই অপেক্ষা করছি। মৃত্যুতেই পরম শান্তি! মৃত্যুতেই জীবন! আমি ফিলিস্তিন থেকে বলছি। নামবিহীন, পরিচয়বিহীন এক মেয়ে। এই মুহুর্তে আমি রয়েছি কঠিন অন্ধকার এক কারাগারে। যেখানে দিন নাকি রাত বোঝা বড় দায়! অবশ্য দিনের আলো পড়লেও এখন আর কি আসে যায়! আমাকে এই কারাগারে আনা হয়েছে গত মাসে। বিশ্বাস করবেন? এই এক মাসে আমার জীবনটা কিভাবে বদলে গেছে?… দিনটা ছিল সম্ভবত বৃহস্পতিবার। সূর্যাস্তের অপেক্ষা করছিলাম। রোজা ভাঙ্গার জন্য খাবার হিসেবে ছিল নামমাত্র গুটিকয়েক খেজুর ও এক মশক পানি। বিদ্ধস্ত চারিপাশ! শুনশান নীরবতায় আমরা দুইবোন ও বাবা-মা। অন্ধকার নামলো, সূর্য মুখ লুকালো পশ্চিম আকাশের ওপাশে। পানির মশক হাতে আব্বুজান এক ঢোক নিতে যাবেন—- গাড়ির শব্দ! আপনাদের একটা কথা বলি, আমাদের এখানে গাড়ির শব্দকে গুলির শব্দ থেকেও বেশি ভয় পাওয়া হয়। গুলির শব্দ মানে তো মেরে ফেলে নতুন একটা জীবন দেওয়া। আর গাড়ির শব্দ মানে, জীবন্ত মৃত্যু! ধরে নিয়ে যাওয়া। শক্ত বুটের জুতা দিয়ে দরজায় সজোরে লাথি মারলো একজন। এরপর কী হয়েছে? কেন? জানতে কী আর বাকি আছে? তবুও বলি, আজ বলতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব।তারা আমার আব্বুজানের দুইপাশ থেকে হাত ধরে ছিড়ে ফেলল। আম্মিকে ধরে এক এক করে ছিড়ে ছিড়ে খেল। আম্মির সেই চিৎকারগুলো আমায় কোন রাতে ঘুমোতে দেয়না। আব্বুর সেদিনের চাহনি আমি কখনো ভুলতে পারিনা। তারা আম্মি-আব্বুকে গুলি করে মারেনি। কী দিয়ে মেরেছে জানেন? পানির কষ্টে। পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের মৃত্যু হয়তো পানির কষ্টের মৃত্যু, তাই না? আমি আব্বুকে দেখেছি। মৃত্যুর আগে তিনি একঢোক পানি চেয়েছিলেন। মুখ দিয়ে আর কোন শব্দ বের হচ্ছিল না। নির্দয় পিশাচটা বুটের জুতো দিয়ে আব্বুর মুখের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। মুখের উপর থুথু ছিটাচ্ছিল। তিনি আমার দিকে অশ্রুসিক্ত চোখে অপারগ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। আচ্ছা! কী ছিল সেই চাহনিতে? শেষ বার্তা? হয়তো বলছিল, “মামুনিরা! আমায় মাফ করে দিও। আমি তোমাদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারলাম না। সেদিন দেখা হবে, যেদিন সবচেয়ে বড় আদালত বসবে।” এক অপারগ বাবার চাহনি রব যেন পৃথিবীর কোন মেয়েকে না দেখান। কিচ্ছু করার ছিলনা তার। কিচ্ছু করার ছিলনা আমার। আমিও অপারগ ছিলাম। আমার চোখও ছিল অপারগ। আমারও চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, “মাফ করে দিয়েন আব্বুজান! আমি আপনাকে একঢোক পানি খাওয়াতে পারলাম না।” আমাকে আর আমার বোনকে ধরে-বেঁধে নিয়ে আনা হলো। দুজনকে দুদিকে ছুড়ে মারলো। তারপর….. আমার পাঁচ বছরের বোনের কী হয়েছে জানিনা। মারা গেছে হয়তো। ছোট মানুষ ছিল। এতজনের চাপ নিতে পারবে না। ভালো হয়েছে মারা গেছে। মারা গিয়েই বেঁচে গেছে। বেঁচে থাকলেই বরং মরে যেত। এখানে যারা বেঁচে আছে তারা সবাই মূলত জীবন্ত লাশ। সাধারণত যারা একটু দুর্বল প্রকৃতির হয় তারা কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ওপারে চলে যায়। যারা শক্ত প্রকৃতির হয় তারা পোড়া কপাল নিয়ে এপারেই দোজখে দিন কাটায়। মৃত্যুও আসে না। দুর্ভাগ্যবশত আমি বোধহয় শক্তদের মধ্যেই ছিলাম। এ জন্যই চাওয়া সত্বেও মরতে পারছিলাম না। তবে আল্লাহ মনে হয় এতদিনে আমার দোআ কবুল করেছেন। প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে আমার। হাঁটুর হাড় ভেঙ্গে গেছে। পায়ের আঙ্গুলগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। রক্ত ঝরছে সেখান থেকে। সাদা একটা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রেখেছি। চোখের সামনে সব ঘোলাটে হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে ওপার থেকে কেও আমায় বলছে, “আর একটু ধৈর্য ধরো! এই তো! আর একটু।” একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি। এ কয়েকদিনে আমার খুব আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হয়েছিল। প্রত্যেক রাতের জুলুমগুলো আমায় আমার সহ্য হচ্ছিল না। আচ্ছা! এ অবস্থায় কী আত্মহত্যা করা জায়েজ আছে? আরে! আমি তো মরতে চাচ্ছিলাম বেঁচে যাওয়ার জন্যে। জানি, জায়েজ নেই। না, আমার মরতে ইচ্ছে হয়না। আমারও আপনাদের মতো বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়। আমিও একটা সুন্দর সোনালী দিনের স্বপ্ন দেখি। যেদিন ইসলামের পতাকা পতপত শব্দে উড়বে। চারিপাশ কালিমার বাণীতে মুখরিত হবে। কেউ একজন এসে আমায় বলবে, “দেখ! ইসলামের বিজয় হয়েছে।” আমি তার হাত জড়িয়ে খুব কাঁদবো। সে আলতো গলায় বলবে, “আরে বোকা কাঁদছো কেন? আজ তো খুশির দিন। আনন্দের দিন। এভাবে কাঁদেনা সোনা।” হে মুসলমান! এ জুলুমের মধ্যে আপনারাও কী নেই? আপনাদের ভাইদের রক্তে মুসলিম দেশগুলো ভেসে যাচ্ছে। আপনাদের বোনদের লুটেপুটে হায়নারা খাচ্ছে। আপনারা কিচ্ছু করছেন না। কাপুরুষের মতো ঘরে লুকিয়ে রয়েছন। আপনাদের কাছে এখন একটাই দরখাস্ত। আপনারা এখানে আসুন। ওদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার দরকার নেই। এসে আমাদেরকে মেরে ফেলুন। আমাদের কারগারকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিন। আমদেরকে কুরআনের উপর পা রাখতে বলা হয়। রাসুলকে গালি দিতে বলা হয়। মানা করে দিলে আমাদের আঙ্গুল এক এক করে কেঁটে ফেলা হয়। চোখ তুলে ফেলা হয়। মুখ সেলাই করে দেওয়া হয়। হায় আল্লাহ! এ জুলুম , এ নির্যাতন কবে শেষ হবে? প্লিজ,আমাদেরকে মেরে ফেলে বাঁচিয়ে দিন। নয়তো তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন। কিছু তো করুন। ইসলামকে এভাবে মরে যেতে দিবেননা। জানিনা চিঠিটা আপনাদের পর্যন্ত পৌঁছাবেও কিনা। এটা না পৌঁছালে অন্য কারোটা পৌঁছাবে। কিন্তু আমি এ বিশ্বাস নিয়ে মরতে চাই, ইসলামের বিজয় আসবে। আর কিছু না করতে পারলে আমাদের জন্য দোআ করুন। রব যেন আমাদের সাহস দেয়। আমরা যেন ঈমানহারা না হয়ে পড়ি। মুখের সর্বশেষ বাক্য যেন কালেমাই হয়। ইতি আপনাদের এক বোন

খাদিজা রায়হানা

Share:

Share on facebook
Share on twitter
Share on email
Share on whatsapp

More Posts

তথ্য ও মিডিয়া সন্ত্রাস – একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

এই দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে কোনো একটি হামলার ঘটনা ঘটলে এর পরে একটি কমন প্যাটার্ন খেয়াল করা যায়। প্রথমেই, নিজেদের সেকুলার,প্রগতিশীল, বামপন্থী বলে দাবি করা

দানশীল ভাই বোনদের কাছে আহবান

দান পাঠাতে- 01859970060 এই নম্বরে ‘ক্যাশ আউট’ করুন, এটি রকেট ও বিকাশ এজেন্ট নম্বর। অথবা পারসোনাল নম্বরে ‘সেন্ড মানি’ করে পাঠাতে পারেন- +88 01711043408 এই

বাংলাদেশ পরিচিতি

ঢাকা বিভাগ প্রশ্নটার সুন্দর একটা বিস্তারিত বর্ণনা দিন ঢাকা বিভাগ প্রশ্নটার সুন্দর একটা বিস্তারিত বর্ণনা দিন Toggle Title Toggle Content

computer

কম্পিউটার এর বেসিক ধারণা

গণনাযন্ত্র বা কম্পিউটার (ইংরেজি: Computer) হল এমন একটি যন্ত্র যা সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুসরণ করে গাণিতিক গণনা সংক্রান্ত কাজ খুব দ্রুত করতে পারে। কম্পিউটার (Computer) শব্দটি গ্রিক “কম্পিউট” (compute)শব্দ থেকে এসেছে। Compute শব্দের অর্থ

Send Us A Message