তথ্য ও মিডিয়া সন্ত্রাস – একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

এই দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে কোনো একটি হামলার ঘটনা ঘটলে এর পরে একটি কমন প্যাটার্ন খেয়াল করা যায়। প্রথমেই, নিজেদের সেকুলার,প্রগতিশীল, বামপন্থী বলে দাবি করা ব্যক্তিরা এটার তীব্র নিন্দা করে, প্রতিবাদ সভা করে। এই কাজটা অবশ্য মোটেও খারাপ কিছু না, বরং প্রায়শই সমর্থনযোগ্য। কিন্তু যেই ব্যাপারটা সমর্থনযোগ্য না সেটা হল হামলার ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের বিচার না চেয়ে ইসলামপন্থীদের ঢালাওভাবে দোষারোপ করা। যেন ঘটনার সঠিক বিচার হওয়ার চেয়ে ইসলামপন্থীদের দোষারোপ করাতেই তাদের মনোযোগ বেশি।কিন্তু যদি আপনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কিংবা তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় লক্ষ রাখেন তবে আরেকটা প্যাটার্ন খেয়াল করবেন। সেটা হল অধিকাংশ সময়ই সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট, পুলিশের কোনো কারণে অপরাধী গ্রেপ্তার না হওয়া। তবে যেই অল্প কিছু ক্ষেত্রে অপরাধী ধরা পড়ে সেখানে দেখা যায় প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা হামলা করেছে। কিছু ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুরা অন্যদের ফাসানোর জন্যে নিজেরাই হামলা করে এসেছে!সুনামগঞ্জের শাল্লার ঘটনায় দেখুন না। প্রথমে হেফাজতে ইসলামকে ঘটনার জন্যে ব্যাপক দোষারোপ করা হল। পরে দেখা গেল যে আসলে হামলা চালিয়েছে যুবলীগ নেতার অনুসারীরা এবং এর পেছনে কোনো ধর্মীয় কারণ নেই বরং জলমহাল নিয়ে দ্বন্দ্বই ছিল এই হামলার মূল কারণ। দোষ যাতে নিজের ঘাড় থেকে মামুনুল হকের ঘাড়ে দেয়া যায় এ কারণেই ফেইসবুক পোস্ট টেনে নিয়ে আসা হয়েছে।কী ভাবছেন? এরকম ঘটনা ব্যতিক্রম? আরে নাহ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু ব্যাপারটা এমন। আসুন মিডিয়ার আসা কিছু খবর দেখি-১) জয়পুরহাটে দেবোত্তর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ : প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে প্রতিমা চুরির অভিযোগ (1)২) মুন্সিগঞ্জে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ (2)৩) কুড়িগ্রামে মুসলমানদের ফাঁসাতে প্রতিমা ভাংচুর করে হিন্দুদের মিথ্যা মামলা (3)৪) মেয়ের জামাইকে ফাঁসাতে প্রতিমা ভাংচুর (4)৫) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শত্রুকে ফের মামলায় ফাঁসাতে নিজ মন্দিরে আগুন (5)৬. কুমিল্লায় দুই ভায়রা ভাইয়ের দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে দূর্গার প্রতিমা ভাংচুর (6)৭. রংপুরে নিরীহ মুসলমানকের ফাঁসাতে মূর্তি ভাঙ্গলো হিন্দুরা (7)৮. রাণীশংকৈলে জমি দখলের অভিনব কৌশল জোর পূর্বক মূর্তি বসিয়ে – (8)৯. ভোলার লালমোহন উপজেলায় প্রতিমা ভাংচুরের নামে মিথ্যে মামলায় যুবলীগ নেতাকে ফাসিয়েছে হিন্দুরা (9)১০. পিরোজপুরে স্থানীয় হিন্দুদের দ্বন্দ্বে মূর্তি ভাংচুর (10)১১. কুড়িগ্রামে ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে মন্দিরে তালা দিলো হিন্দুরা (11)দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ধর্মীয় কারণে হয় না। কিন্তু তবুও প্রতিবার হামলার কোনো ঘটনা ঘটলেই কেম যেন নিজেদের প্রগতিশীল দাবি করা মানুষেরা ইসলামপন্থীদের দায়ী করতে উঠে পড়ে লাগে। যেন দেশে ব্যাপক ধর্মীয় দাঙ্গা লেগে আছে এরকমটা প্রমাণ করতেই হবে। পাশাপাশি যখনই ঘটনার আসল রহস্য ফাস হয়ে যায় তখন তারা একেবারেই রহস্যজনক কারণে নীরব হয়ে যান।আরেকটা ব্যাপার উল্লেখযোগ্য। গত ১ মাসের মিডিয়ার খবরের দিকে যদি তাকান,তবে অবাক হবেন, বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর হামলা-ভাংচুরের ঘটনা প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। কোন কোন হামলা ভাংচুরের ঘটনায় নিহত আহত হওয়ার ঘটনাও আছে।নারী-পুরুষের কান্নাকাটির ছবিও কম নেই সেখানে।যেমন, গত ১ মাসের খবরে আছে—মাগুরায় বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট, আহত ৫(12)–রাজশাহীতে দোকানে সশস্ত্র হামলা-লুটপাট, নিরব পুলিশ (13)–কসবায় সাবেক সেনা সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়েরের উপর হামলা বাড়িঘর ভাংচুর লুটপাট (14)–দুর্গাপুরে মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্চিত করে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট (15)–চরফ্যাসনে কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট (16)–সিদ্ধিরগঞ্জে অন্যের জমি জোরপূর্বক দখলে নিতে হামলা ভাংচুর ও লুটপাটের অভিযোগ (17)–ফরিদপুরে অর্ধশতাধিক বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, লুটপাটের অভিযোগ (18)কিন্তু এগুলোর কোনো ঘটনায় আমরা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে দেখি না। কিছু ঘটনা তো জাতীয় মিডিয়াতেও আসে না। অথচ শাল্লার ঘটনায় কেউ আহত পর্যন্ত না হলেও সেটা জাতীয় মিডিয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করা হল! আর এদিকে মোদিবিরোধী আন্দোলনে ১৭+ মানুষ নিহত হলেও প্রায় নীরব মিডিয়া। আনন্দবাজার পত্রিকা তো এটাকে “পাকিস্তানপন্থীদের তাণ্ডব” বলেই চালিয়ে দিল!!উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা দেখলাম যে বাংলাদেশে যারা নিজেদের সেকুলার, প্রগতিশীল বলে দাবি করে তাদের অধিকাংশ আসলে ভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে আছে।তো শাল্লার ঘটনার পর নিজেদের হিপোক্রেসি প্রকাশ পাওয়ার পরে এক শ্রেণির লোক ভিন্ন ইস্যু টেনে এনে সেটাকে নিজেদের পিঠ লুকানোর জন্যে ইউজ করতে থাকলেন। (19) সেটা হল হেফাজতে ইসলামের একজন সহসভাপতির বক্তব্য যেখানে উনি বলেছেন যে ” হিন্দুধর্ম কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্ম না”। তাদের দাবি হল এ কথা বলার মাধ্যমে উনি হিন্দু ধর্ম অবমাননা করেছেন। এর সাথে আবেগ যুক্ত করার জন্যে কেউ বলা শুরু করল যে এখন যদি বলি “ইসলাম কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্ম না” তখন তো মুসলিমেরা হামলা, ভাঙচুর চালাবে ধর্ম অবমাননা এর অভিযোগ এনে। কাউকে মেরেও ফেলতে পারে নাকি!!স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, ভিন্ন ইস্যু টেনে আনার একমাত্র কারণ হল নিজেদের অপমানের হাত থেকে বাচানো। তারা যে হিপোক্রেট এটা যাতে মানুষকে ভুলিয়ে দেয়া যায়। তো এবার তাদের দাবির ব্যাপারে বলি।প্রথমত, “হিন্দু ধর্ম কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্ম না” এই কথাটা বলা ধর্ম অবমাননা না। এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তেমনিভাবে “ইসলাম কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্ম না” কথাটা শুনতে একজন মুসলিম হিসেবে আমার ভালো না লাগলেও এর জন্যে বক্তাকে আক্রমণ করা যায় না। এটা নিয়েও বিতর্ক করা যায়। সেখানে যৌক্তিকভাবে নিজের দাবি উপস্থাপন করা যায়। সহজ উদাহরণ দিচ্ছি, যখন কেউ বলে যে আমি একজন মুসলিম তখন সে কিন্তু ইন্ডিরেক্টলি এটা বলে যে সে ইসলাম বাদে অন্য কোনো ধর্ম স্বীকার করে না। একজন হিন্দুর ব্যাপারও কিন্তু এমন। একই সাথে কেউ একাধিক ধর্মে বিশ্বাস করতে পারে না। এটা ফিলোসফিক্যালি ইম্পসিবল আইডিয়া। তো ধর্ম অবমাননা হবে তখন যখন একজন কোনো ধর্মকে গালি দিবে, অশ্লীল গল্প বানাবে বা বিকৃত ছবি/কার্টুন আঁকবে। এর বাইরে নিজের অবস্থান বর্ণনা করাটা ধর্ম অবমাননার মধ্যে পড়ে না।এখানে তারা একটা আবেগী যুক্তি দেখায়। যদি আজকে একজন হিন্দু বলে “ইসলাম কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্ম না ” তখন তো দেশে মূর্তি ভাঙার হিড়িক পড়ে যাভে, হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হবে, হত্যা-নির্যাতন করা হবে নাকি!! কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই সেরকম?আচ্ছা, প্রিয়া সাহা যখন ট্রাম্পের কাছে বললেন যে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর গণহত্যা চালানো হচ্ছে এবং তাদের রক্ষায় ট্রাম্পের সাহায্য দরকার তখন কি সবার উপর হামলা করা হয়েছিল? কয়েকমাস আগে যখন সিলেটে হিন্দুরা মিছিলে স্লোগান দিল “ধইরা ধইরা জবাই কর” বলে তখন কি হিন্দুদের পালটা জবাই করা হয়েছে? হিন্দু হওয়ার কারণে এদেশে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে একইসাথে ২ বা ততোধিক জনকে এরকম কোনো উদাহরণ গত ৫/৬ বছরে দেখাতে পারবেন কেউ? উত্তর হল, না। তাহলে কিসের উপর ভিত্তি করে তারা এরকম হাস্যকর দাবি তোলে?পাশাপাশি ধর্ম অবমাননা নিয়েও কিন্তু নিজেদের বামপন্থী দাবি করা দলগুলোর হিপোক্রেসি লক্ষ করা যায়। তসলিমা নাসরিন যখন তার “নিষিদ্ধ” কেতাবে দেবীমূর্তির নগ্ন ছবি আকা শিল্পীর ইচ্ছা বলেন তখন সেটা মুক্তচিন্তা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন তার “অর্ধেক জীবন” কেতাবে দেবীমূর্তি চুম্বন এবং স্তন টেপার বর্ণনা দেন তখন সেটা হয়ে যায় সাহিত্য। আনন্দবাজার পত্রিকা যখন দেবীমূর্তি নিয়ে রসাল উদ্দীপক গল্প ফাঁদে তখন সেটা হয়ে যায় রম্যরচনা।প্রশ্ন হল, তাদের এরকম করার কারণ কী?ইংরেজরা যখন এদেশে আসে তখন এদেশের হিন্দু – মুসলমান উভয়ই কিন্তু শুরুর দিকে একত্রে ছিল। এই একত্রে থাকাটা ছিল ইংরেজদের জন্যে হুমকি। এই হুমকি থামানোর জন্যে তাদের “Divide and Rule” নীতিও তো আপনাদের অজানা না সম্ভবত। তো এই “Divide and Rule” নীতি তারা কিভাবে এবং কেন বাস্তবায়ন করল?ইংরেজরা আসার আগে এই উপমহাদেশে মক্তবের সংখ্যা ছিল প্রায় আশি হাজার। ইংরেজদের ১৯০ বছরের শাসন শেষে এই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র চার হাজারে। এই ধরণের উপমহাদেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা ছিল ইংরেজদের জন্যে হুমকি। তাই মক্তব নির্মূল ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বিস্তারিত জানতে পড়ুন উইলয়াম হান্টারের “দি ইন্ডিয়ান মুসলমান’স” কেতাবটি।তো এরপরে ইংরেজরা এদেশে তাদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করল। সবাই তাদের প্রণীত কারিকুলাম অনুসারে পড়বে। এই শিক্ষায় তাদের অরিয়েন্টালিস্টদের লেখা বিকৃত ইতিহাস পড়ানো হত যাতে হিন্দু এবং মুসলিম আদিমকাল থেকে পরস্পরের শত্রু এমন ন্যারেটিভ তৈরি করা যায়। এর ফায়দা হল, হিন্দু এবং মুসলিম পরস্পরের সাথে শত্রুতা করবে এবং উভয়েই তাদের প্রধান শত্রু তথা ইংরেজদের বিরোধিতা ভুলে যাবে। অন্যদিকে ইংরেজরা নিজেদের শক্তিশালী করে গড়ে তুলবে। তখন হিন্দু, মুসলিম উভয়েই তাদের ভরসার জন্যে ইংরেজদের সাথে হাত মেলাতে (পড়ুন গোলামি করতে) আগ্রহী হবে।আমার মতে, এদেশে যারা নিজেদের বামপন্থী বলে দাবি করে তাদের অবস্থানটা অনেকটা এই ইংরেজদের মত। এরা ঘৃণাজীবী। তারা এদেশে কোনো সংখ্যালঘু নির্যাতন হলে প্রকৃত ঘটনার বিচার চাওয়ার তুলনায় ইসলামপন্থীদের আক্রমণ করতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে এদেশের হিন্দুদের অধিকাংশ এবং মুসলিমদের একাংশ তাদেরকেই নিজেদের আশ্রয়স্থল ভাবে। এই সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন মূলত মোদির বন্ধু। এরাই ভারতে এমন ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করে যাতে মনে হয় যে বাংলাদেশে হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার হয়ে আর থাকতে পারছে না। হিন্দুত্ববাদের ধোয়া ভারতে বিজেপি তুলতে পারে মূলত এদের কারণেই। উদ্দেশ্যটা বোঝা সহজ, যদি হিন্দু, মুসলিমদের মধ্যে ঘৃণাই না থাকে তবে এদের অসাম্প্রদায়িকতা, বহুত্ববাদ, সহনশীলতার গাল-গল্প শুনবে কে? এদের নিজেদের এসব স্লোগান টেকানোর স্বার্থেই ঘৃণা টিকিয়ে রাখা লাগে। পাশাপাশি তাদের মেজরিটি – মাইনরিটি থিওরি গেলানোও একটা কারণ। এই থিওরি গেলাতে পারলে মানুষকে বোঝানো যাবে যে সকল জায়গাতেই সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়। এটা বন্ধ করতে হলে তাদের সমর্থন করাই একমাত্র উপায়।এদের হিপোক্রেসির চাইলে আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। কয়েকদিন আগে ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্ট (DSA) বাতিলের দাবির কথাই ধরা যাক। ২০১১-১২ সালের দিকে নিজেদের প্রগতিশীল দাবি করা মানুষগুলো ডিএসএ এর জন্যে সরকারের কাছে দাবি জানায়। এদের কথা হল মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের ধরে ধরে জেলে পুড়তে হবে। এ জন্যে প্রথম আলো ব্লগ, সামহোয়ারইনব্লগ সহ আরো অনেকে কনফারেন্স পর্যন্ত করেছে।(20) উদ্দেশ্য বোঝা সহজ, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা স্রেফ আইওয়াশ। মূল উদ্দেশ্য হল, জামাত,হেফাজত, বিএনপি সহ বাকি সবাই এই আইনে জেলে পচে মরুক। খালি তারা টিকে থাকলেই হয়। তাদের এহেন দাবির প্রেক্ষিতেই আসে ৫৭ ধারা যা পরবর্তীতে DSA হিসেবে আসে।যখন দেখা গেল যে একই আইন সেই তাদের বিরুদ্ধেই ইউজ করা হচ্ছে তখন তাদের টনক নড়ল। এরপরে এই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হল।তো এবার বলুন, কাদের সাথে আন্দোলন করব? যারা এককালে DSA এর পক্ষে সমাবেশ করেছিল তাদের সাথে? এসব হিপোক্রেটদের সাথে? এদের সাথে আন্দোলন করে আপনি সুশীল সাজতে পারেন তবে আমার পক্ষে তা সম্ভব না।এরপর এদের ঘৃণা ছড়ানোর আরো নমুনা দেখুন। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। শাহবাগে যখন আন্দোলন হয় তখন এর উদ্দেশ্য বলা হচ্ছিল রাজাকার বিরোধিতা। প্রচুর মানুষ সেখানে গিয়েছিল। আমার বয়স তখন আট কি নয় বছর। প্রথম আলোতে নিউজ পড়ে উত্তেজিত হয়ে বাবার সাথে আমিও কিন্তু এককালে গিয়েছিলাম শাহবাগ। অবশ্য সেটা একদিনের জন্যে মাত্র। যায় হোক,তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলাটা জরুরি। এখনো অনেকে আছেন যারা বিশ্বাস করেন যে শাহবাগ ছিল রাজাকার বিরোধী আন্দোলন। আসলেই কি তাই? একটু গভীরে যায়। তাদের বক্তব্য ছিল, রাজাকারদের ধরে ফাসি দিতে হবে। কেউ তো শাহবাগে প্রকাশ্যে জনতার মঞ্চে ফাসি দেয়ার কথাও বলেছিলেন। তাদের একাংশের কথা হল, রাজাকার মাত্রই ফাসি। অপরাধ, অপরাধের সত্যতা বিবেচ্য না। প্রসিকিউশন তারা মানতে অনাগ্রহী। মানে কাউকে রাজাকার ট্যাগ দেয়া গেলেই তার রক্ত হালাল। তাকে হত্যা করলে সবাই উল্লাস করবে। এটা ফ্যাসিবাদ ছাড়া আর কী? প্রায় সব মহল থেকেই এর সমালোচনা এসেছে। এককালে শাহবাগ আন্দোলনের নেতা এবং কবি ফরহাদ মজহারের মতে, ” শাহবাগ ছিল ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত রূপ”।(21) ফ্রান্সে নির্বাসিত মানবাধিকারকর্মী এবং ইতিহাস গবেষক পিনাকী ভট্টাচার্যের মতে, ” শাহবাগে মানুষ কেন গিয়েছিল তা আন্দোলনে অংশ নেয়া অধিকাংশই জানত না”। উল্লেখ্য, এখানে যে রাজাকার মুখ্য বিষয় না সেটাও তো স্পষ্ট৷ “একটা একটা শিবির ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর” স্লোগান তো এই শাহবাগেই দিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। কোলের শিশু পর্যন্ত এই ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে এসে ওরকম স্লোগান দিচ্ছিল। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, কেউ শিবির করলে তার বিচার পাওয়ার অধিকার নেই। তারা না-মানুষ, নিষিদ্ধ। যে কেউ, যেকোনো মুহুর্তে তাদের মেরে ফেলতে পারে। তার রক্ত হালাল। তাকে মারার জন্যে কোনো জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। স্পষ্টতই, শিবির মুখ্য উদ্দেশ্য না। আপনার রক্ত হালাল হওয়ার জন্যে শিবিরের নেতা হওয়ার দরকার নেই, কর্মী হওয়ারও দরকার নেই। নামাজের জন্যে ডাকলে, ইসলামের দাওয়াহ দিলেই আপনি শিবির। তখন যে কেউ চাইলেই আপনাকে মেরে ফেলতে পারে। আপনার জীবনের কোনো মূল্য নেই।আবরার ফাহাদকে যখন হত্যা করা হল, তখন ছাত্রলীগ কর্মীরাও কিন্তু জবানবন্দিতে এই কথাই বলেছিল। আবরার মানুষকে নামাজের জন্যে ডাকত তাই তারা সন্দেহ করেছিল যে সে সম্ভবত শিবির করে। এছাড়া চারপাশে অনেক মানুষকেই দেখেছি কেউ দ্বীনের পথে ফিরে আসলে সে শিবির করে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ করে। কারণ শিবির করলে তো তাকে হত্যা করা জায়েজ। ২০১১-১২ থেকে এ পর্যন্ত যতজনকে “শিবির সন্দেহে” তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার প্রতিটির ক্ষেত্রে একাংশের দায় অবশ্যই শাহবাগের উপর যায়। এভাবেই রাজাকারের বিচার চাওয়ার যৌক্তিক দাবিকে তারা ইসলামবিদ্বেষের দিকে নিয়ে যায়।তবে এই ইসলামবিদ্বেষের ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাওয়াটা অবশ্য দিন শেষে একটা ভালো ব্যাপার ছিল। কেননা এর ফলে যারা এককালে আন্দোলনে গিয়েছিল তারা সেখান থেকে একে একে সরে আসতে থাকে। পরিচিত অনেককেই দেখেছি যারা এককালে শাহবাগে গিয়েছিল তাদেরকে সেই কথা মনে করিয়ে দিলে তারা লজ্জায় কুকড়ে যায়। ব্যাপারটা পরিষ্কার না হলে সমস্যা হত অনেক।পাশাপাশি এখানে আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয়। তারা বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী। অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ার কিছু নেই, বুঝিয়ে বলছি।তাদের অন্যতম একটা এজেন্ডা ছিল বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ইসলামকে বিরোধপূর্ণ দেখানো। কেউ দাড়ি-টুপি পড়লেই তাকে আফগানি পোষাক বলা, সঠিক বাংলাকে আরবি – ফার্সি মেশানো বাংলা বলে ট্যাগ দেয়া এখান থেকেই শুরু হয়। বাঙালি বলতে যে সভ্যতাগতভাবে মুসলমান (ধর্মীয়ভাবে না) এই সত্য তারা অস্বীকার করতে চায়।(22) এ কারণে অনেকেই শাহবাগ আন্দোলনকে বাঙালি বিদ্বেষী বলেও অভিহিত করেছেন।আর তাদের এই ফ্যাসিবাদী অবস্থা থেকে মানুষ মুক্তি চাচ্ছিল। এই অবস্থায় উত্থান ঘটে হেফাজতে ইসলামের। হেফাজতে ইসলামকে যে মানুষ এত সহজে একটা উচ্চ আসনে বসিয়েছে এবং তারা যে এত জনপ্রিয় হয়েছে তার কারণ কিন্তু শাহবাগ। হেফাজতে ইসলামকে পছন্দ করতেন না এমন অনেককে আমি দেখেছি তাদের আন্দোলনে সমর্থন দিতে। কারণ হল, তারা যেকোনো উপায়ে শাহবাগ বিরোধী প্ল্যাটফর্ম চাচ্ছিল আর হেফাজত ঠিক সেই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করেছে। এই কারণে সত্য হল, হেফাজতের উত্থান মূলত শাহবাগ ঘটিয়েছে। ২০১৩ এর আগে দেশের একটা বড় অংশ মানুষই হেফাজতের সাথে তেমন একটা পরিচিত ছিলেন না।যায় হোক, শেষ একটি কথা এবং আহবান জানিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানেই ফিরে যায়। মাসজিদে শুকরের গোশত ফেলা কিংবা মন্দিরে গরুর গোশত ফেলা এগুলো সব কলোনিয়াল আমলের ব্লেইম গেম। উদ্দেশ্য বোঝা সহজ, উভয় সম্প্রদায় নিজেরা দাঙ্গা লাগিয়ে শক্তিক্ষয় করবে এবং মাঝখান দিয়ে লাভবান হবে শান্তির ধ্বজাধারীরা।বায়তুল মোকাররমে কয়েকদিন আগে কোনো কর্মসূচি ছিল না কোনো দলেরই। অথচ সেখানে হামলা চালানো হয়। কারা করেছে তার সুস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ থাকলেও তা নিয়ে অদ্ভুতভাবে চুপ মিডিয়া। সময় টিভি তো এটাকে “মুসল্লিদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ” বলে চালিয়ে দিল। এটা আসলে খুব সুন্দর একটি প্লট ছিল পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বাস্তবায়নের জন্যে। স্বভাবতই হেফাজত কর্মসূচি দিবে। এরপর তাদের বদনাম করা যাবে সহজেই।উদাহরণ দিচ্ছি, হেফাজত যখন প্রথম হরতাল ডাকে ঐ সময় গোটা দেশের মানুষ কিন্তু তাদের সমর্থন দিয়েছিল। আমার এক হিন্দু সহপাঠীকে তাদের কর্মসূচির ব্যাপারে সমর্থন জানাতে দেখেছি। এমন সময় যদি কেউ মন্দির ভাঙচুর করে, কলেজ ভাঙচুর করে তবে সেটা কি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা না? সুস্থ কেউ কি এধরণের কাজ করবে?অথচ প্রকৃত ঘটনা না জেনেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে হেফাজত “তাণ্ডব” চালিয়েছে বলে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ ঢাকায় বায়তুল মোকাররমে যে সরকারি দলের কয়েকজন লোক পাঞ্জাবি-পড়ে মানুষ পিটাইল তার প্রমাণ তো আছে।(23)ছাত্রলীগ যে হেফাজতের হরতালে বাস ভেঙেছিল তারও তো প্রমাণ আছে। অন্য একটি রাজনৈতিক দলও তো জড়িত ছিল বলে পুলিশ পর্যন্ত স্বীকার করেছে।(24) আর এমন সময় মূর্তি ভাঙলে কার লাভ সেটা বোঝাও তো কঠিন কিছু না। তবুও বরাবরের মতই এদেশে নিজেদের বামপন্থী(!) দাবি করা লোকেরা তাণ্ডব নিয়ে ব্যস্ত। এর আসলে কারণ খুজতেও যায় না। (25) আবার কেউ কেউ কোন এক ডিউটিরত সাংবাদিককে জোর করে ৪ বার কালিমা পড়িয়েছে তা নিয়ে হইচই করে। ব্যাপারগুলো যে গাল-গল্পও হতে পারে সেদিকেও কারো খোজ নেই। (26)তবে একথা সত্য যে ভাঙচুরের একাংশ অবশ্য হেফাজত কর্মীরাই করেছে। তবে এজন্যে যদি আন্দোলনকেই তারা “তাণ্ডব” বলে চালিয়ে দেয় তবে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কি তারা সমর্থন করে না ? কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের Black Lives Matter (BLM) আন্দোলন? যায় হোক, শেষ কথায় আসি। এই যে হেফাজত মন্দির ধ্বংস করেছে বলে গুঞ্জন উঠল এই ঘটনার পরে কি হিন্দু সহপাঠী আর হেফাজতকে সমর্থন করবে? কিংবা এদেশের মুসলিমদের অধিকাংশ? স্পষ্টতই উত্তর হচ্ছে, না। তাহলে এগুলো প্রচার করলে লাভ কাদের?উত্তর তো জানা থাকার কথা। যারা এদেশে শান্তির ধ্বজাধারী তাদের। যদি হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব জিয়ে থাকে তবে এদেরই লাভ। যতদিন ঘৃণা আছে ততদিন ঘৃণাবিরোধী রাজনীতি করা যাবে। ঘৃণা না থাকলে এই রাজনীতির কোনো মূল্য নেই। তাই সবাইকে অনুরোধ করব, প্রকৃত উস্কানিদাতাদের চিনুন। কারা সহিসংসতার উস্কানিদাতা তাদের চিনুন। এরপরে এদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।

References:

1.(https://samakal.com/today…/tp-uttaranchal/article/18023410)

2.(https://www.dailynayadiganta.com/more-news/547112/)

3.(https://www.dailynayadiganta.com/more-news/547112/)

4.(https://www.bd-journal.com/bangladesh/46683/)

5. http://archive.is/aiwMo

6. http://archive.is/ekG1x

7. http://archive.is/yhNgI

8. – http://archive.is/Ognbd

9. http://archive.is/SSd5Y

10. http://archive.is/Z0BT6

11. https://archive.is/LQyCn

12. (https://cutt.ly/Oxqsg50)

13. (https://www.varendrabarta.com/74347/)

14. (https://cutt.ly/SxqsQvs)

15. (https://cutt.ly/Wxqdkso)

16.(https://cutt.ly/txqsAYo)

17.(https://sunmision.tv/news/1874/)

18.(https://dailydeshkantha.com/post/6491/)

( ১-১৮ পর্যন্ত রেফারেন্স গুলো নয়ন চ্যাটার্জির দুইটি আর্টিকেল থেকে সংগৃহীত)

19. https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=3520124431424793&id=100002818128016

20.https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10159332517645742&id=718000741

21. https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=289547879195733&id=100044215700385

22. https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10157278453415742&id=718000741

23. https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=909633246496530&id=100023495901521

24. https://www.kaleralo.com/archives/86663

25. https://www.facebook.com/153686271312396/posts/4472862626061384/

26. https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=2845613882409758&id=100008835210089

Share:

Share on facebook
Share on twitter
Share on email
Share on whatsapp

More Posts

আমি ফিলিস্তিন থেকে বলছি

চিঠিটা আপনাদের কাছে পৌছানোর আগ পর্যন্ত আমি থাকবো কিনা জানিনা। মৃত্যু অনেক কাছে এসে গেছে। এখন অবশ্য জীবন থেকে মৃত্যুই বেশি সহজ হয়ে পড়েছে। মৃত্যুরই

দানশীল ভাই বোনদের কাছে আহবান

দান পাঠাতে- 01859970060 এই নম্বরে ‘ক্যাশ আউট’ করুন, এটি রকেট ও বিকাশ এজেন্ট নম্বর। অথবা পারসোনাল নম্বরে ‘সেন্ড মানি’ করে পাঠাতে পারেন- +88 01711043408 এই

বাংলাদেশ পরিচিতি

ঢাকা বিভাগ প্রশ্নটার সুন্দর একটা বিস্তারিত বর্ণনা দিন ঢাকা বিভাগ প্রশ্নটার সুন্দর একটা বিস্তারিত বর্ণনা দিন Toggle Title Toggle Content

computer

কম্পিউটার এর বেসিক ধারণা

গণনাযন্ত্র বা কম্পিউটার (ইংরেজি: Computer) হল এমন একটি যন্ত্র যা সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুসরণ করে গাণিতিক গণনা সংক্রান্ত কাজ খুব দ্রুত করতে পারে। কম্পিউটার (Computer) শব্দটি গ্রিক “কম্পিউট” (compute)শব্দ থেকে এসেছে। Compute শব্দের অর্থ

Send Us A Message